বন্ধুর স্ত্রী

বন্ধুর স্ত্রী
বিশ্বজিৎ চৌধুরী | ডিসেম্বর ১২, ২০১৪

যেন এক আশ্চর্য আহ্বান। সেলফোনের রিং বেজে উঠলেই ধড়ফড় করে ওঠে বুক, স্ক্রিনে তার নামটা ভেসে উঠলেই গলা শুকিয়ে যায়, সাড়া দিতে দিতে কেটে যায় বেশ কটি মুহূর্ত। বাজতে বাজতে কলিং রিং যখন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তখন কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় সে বলতে পারে, হ্যালো…। ওপাশ থেকে তখন পাহাড়ি ঝরনার উচ্ছ্বাস শোনা যায়, কী রাকিব ভাই, কোথায় হাওয়া হয়ে গেলেন, আজকাল আমাদের কথা একেবারে মনেই পড়ে না বুঝি?
কী উত্তর দেবে রাকিব, এ রকম সামান্য অভিমানের সুর তার মনে তোলপাড় জাগিয়ে দেয়। কী করে জানাবে তার ফোনের অপেক্ষায় কী রকম দুঃসহ দিন কাটে তার, ‘প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে সূর্য ডোবে রক্তপাতে…।’ ফোনটা যখন আসে তখন আকুল অধীরতা জাগিয়ে তোলে, বাসায় একবার ঘুরে যাওয়ার অনুরোধ জানালে সেই অধীরতা যেন কী এক আকাঙ্ক্ষায় রূপান্তরিত হয়। ঝর্নার বাসায় গল্প-আড্ডায় কত শত বিষয় উঠে আসে, রাজনীতি থেকে খেলার মাঠ, শেয়ারবাজার থেকে ফেসবুক বা সিনেমা। কখনো ওখানে রাতের খাবারটা সেরে আসে, খাবার টেবিলে বুবাইয়ের সঙ্গেও তার বয়সোচিত আগ্রহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গল্প করে। ফিরে আসার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে হেসে বিদায় জানায় ঝরনা। সেই হাসি বাকিটা পথ তার পিছু নেয়, কিন্তু কী এক গভীর অতৃপ্তিতে মনটা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। সেই অতৃপ্তি থেকে কিছুতেই মুক্তি মেলে না।
আজ অবশ্য গলায় কোনো রকম চাপল্য নেই, বরং বেশ গম্ভীর, টিভির সংবাদ পাঠিকার মতো জরুরি সংবাদটিই জানায় যেন, খুব দরকার আছে, আজ একবার আসতে পারবেন?
ঝরনা আসলে জানে আসতে পারবে রাকিব, যত কাজই থাকুক সব ফেলে ছুটে আসবে, তবু এটুকু সৌজন্য সে রক্ষা করে, কিংবা সামান্য একটু দূরত্ব রচনা করার এ-ও এক কৌশল।
পারব, কখন আসব?
আজকাল ভাবি সম্বোধনটা খুব দরকার না হলে করে না রাকিব। করে না যে সেটা ঠিকই বুঝতে পারে ঝরনা, তাতে তেমন আপত্তি নেই, কিন্তু নিজের মুখে তো কখনই বলবে না, আপনার চেয়ে বয়সে তো ছোটই হব, আপনি বরং আমাকে তুমি করে বলবেন, নাম ধরে ডাকবেন…।
সন্ধ্যার দিকেই আসেন…, আজ কিন্তু জিন্স আর টি-শার্ট পরে আসবেন, আজকাল পাজামা-পাঞ্জাবি পরা জামাইবাবু টাইপের এমন একটা ভাব নেন আপনি… বোরিং… হি হি হি।
এতক্ষণে যেন গাম্ভীর্য ভেঙে আসল রূপে ফিরে আসে ঝরনা, আর তখনই সেই অধীরতা জেগে ওঠে রাকিবের মনে এবং যথারীতি তা রূপান্তরিত হয় অনিবার্য আকাঙ্ক্ষায়।
সকালটা আজ কেন জানি বিমর্ষ ছিল, মেঘলা আকাশই এর কারণ কি না বুঝতে পারেনি, এখন অফিসকক্ষের জানালার পর্দা সরিয়ে দেখতে পেল বাইরে রোদ-ঝলমলে আকাশ। কৃষ্ণচূড়া গাছটির সবুজ ডালপালা আর লাল ফুল উজ্জ্বল রোদের আলোয় আনন্দময়।
ঝরনা রাকিবের বন্ধু জামিলের স্ত্রী। একটি বেসরকারি ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলের শিক্ষিকা। বছর খানেক আগে হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় রাকিবদের এই বন্ধুটি মারা গেলে আবেগ ও যন্ত্রণার প্রথম পর্বটি কাটিয়ে ওঠার পর, ছোট্ট একটি শিশুপুত্রকে নিয়ে প্রায় অকূল সমুদ্রেই পড়েছিল তাঁর স্ত্রী। যতটা না অর্থনৈতিক কারণ, তার চেয়ে বড় ছিল সামাজিক সমস্যা।
একটি বেসরকারি সাহায্য সংস্থার বড় কর্মকর্তা জামিল আহমেদকে চাকরিসূত্রে কিছুদিন বান্দরবানে থাকতে হয়েছিল। সেখানে ঝরনা ত্রিপুরার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিল সে। স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালির বিদ্যমান বিরোধে একটা ইন্ধন হয়ে উঠতে পারত এই সম্পর্ক। কিন্তু পাহাড়ি কয়েকজন যুবকের সঙ্গে বন্ধুত্বের সুবাদে সেই অঘটন ঘটেনি। ঝরনাকে নিয়ে নিরাপদে পালিয়ে এসেছিল জামিল। চট্টগ্রাম শহরে এসে দুই পরিবারেরই অমতে বিয়ে করেছিল ওরা। বিয়ের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমান হয়েছিল ঝরনা, কিন্তু তাতেও জামিলের পরিবারে জায়গা হয়নি তার।
জামিলের সবকিছুই ঈর্ষণীয় ছিল বন্ধুদের কাছে, সেটা ছাত্রজীবনের কৃতিত্ব বা চাকরিতে তার দ্রুত উন্নতি থেকে শুরু করে সবকিছুই। ঝরনাকে দেখার পর বন্ধুদের সেই ঈর্ষার সলতেটা যেন উসকানি পেয়েছিল আরও। উজ্জ্বল ফর্সা রং, সোজা ঝরঝরে চুল, গ্লোসি কাগজে ছাপানো ম্যাগাজিনের মডেলদের মতো মসৃণ ত্বক তো বটেই, এমনকি পাহাড়ি মেয়েদের ক্ষেত্রে দুর্লভ টিকালো নাক ও বড় দুটি চোখের এমন অসাধারণ সমন্বয় যেন হাহাকার জাগিয়ে দেয় পুরুষের মনে; আর শরীরে পাহাড়ি দুর্গম পথের মতো বিপজ্জনক সব বাঁক!
জামিল বন্ধুবৎসল আড্ডাবাজ মানুষ, ঝরনারও মিশুক স্বভাব আর সহজাত রসবোধের কারণে ওদের বাসাটা রাকিবদের সান্ধ্য আড্ডার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। রাকিব, আহসান আর মিলন এই তিনজন ছাড়া আরও কেউ কেউ আড্ডায় যোগ দিয়েছে নানা সময়ে, কিন্তু তিনজন যেন অনিবার্য। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যানজট, হরতালের মতো যাবতীয় জাগতিক দুর্ভোগ অগ্রাহ্য করেও কী এক অদৃশ্য সুতোর টানে যেন জামিলের বাসায় হাজির হয়েছে ওরা। মিলনের বউ সোনিয়া যে রাগ চেপে রেখে ‘ওই বাসাটা তো তোমাদের মৌচাক’ বলে খোঁচা দিয়েছিল, তা কি খুব অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় আসলে? জামিল তার বাসার আড্ডায় খানাপিনা বা আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি রাখেনি কোনোদিন, কিন্তু ঝরনার উপস্থিতি, তার হাসি উচ্ছলতা বা প্রগলভতা কিংবা কোনো কোনো দিন সবার অনুরোধে আদিবাসী গান গেয়ে শোনানো—এসব কি রানি-মৌমাছিকে ঘিরে এক অদৃশ্য মৌচাকের দৃশ্যকল্প তৈরি করেনি?
মাঝেমধ্যে লং ড্রাইভে যাওয়ার পরিকল্পনা ফাঁদত জামিলই। নিজে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসত, পাশের আসনে ঝরনা, আর তিন বন্ধু ঠাসাঠাসি করে পেছনের আসনে বসে জমিয়ে রাখত সেই আনন্দযাত্রা।
জামিলের হঠাৎ মৃত্যু রাকিবদের বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু বিপদে তিন বন্ধু পাশে দাঁড়িয়েছিল ঝরনার। এত বড় একটা আঘাত পাওয়ার পরও ঝরনা তার নিজের মা-বাবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে কোনো সাড়া তো পায়ইনি, উপরন্তু যার জন্য জাত-কুল খুইয়ে চলে এসেছিল প্রায় এক কাপড়ে, সেই জামিলের পরিবারেরও (মা ও দুই বোন) এতটুকু সহানুভূতি পায়নি। এমনকি তারা এ রকম একটি দৈব-দুর্ঘটনার জন্যও কোনো না কোনোভাবে দায় চাপানোর চেষ্টা করেছে মেয়েটার কাঁধে। ছোট্ট একটি শিশুকে নিয়ে তখন সত্যি দিশেহারা ঝরনা। রাকিব, আহসান আর মিলন সেই সময়টাতে পাশে থেকে প্রকৃত বন্ধুকৃত্য করেছে।
এক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর এখন অনেক কিছুই স্বাভাবিক, বন্ধুর মৃত্যুর শোকটা কাটিয়ে উঠেছে রাকিবেরা। স্কুল, টিউশনি আর শিশুসন্তানকে পেলেপুষে বড় করে তোলার একটা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে ঝরনারও বোধকরি স্বামীর শোকে আহাজারি করার ফুরসত মেলে না। আগের নিয়মে সেই আড্ডার সুযোগ আর নেই, কিন্তু প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ঝরনা যখনই ডেকে পাঠিয়েছে, ছুটে গেছে রাকিব, হয়তো অন্য দুজনও। অন্য দুজনের মনের কথা জানার সুযোগ হয়নি, রাকিব কিন্তু সেই ডাক পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থেকেছে প্রতিদিন, কখনো তেমন যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই অপেক্ষায়-অভিমানে দুর্বহ সময় কাটিয়েছে।
আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত অস্থিরতার মধ্যে কেটেছে, সকালে মনটা ভালো হয়ে গিয়েছিল ফোন পেয়ে, কিন্তু তারপর সময় যত এগিয়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অস্থিরতা। কেন অস্থিরতা নিজেই বুঝতে পারে না। এত দিনের সম্পর্ক, তবু প্রতিবারই এ রকম হয়, ঝরনার ডাক পেলে অস্থির হয়ে ওঠে অপেক্ষার মুহূর্তগুলো। অথচ জামিল যত দিন বেঁচে ছিল এ রকম হতো না কখনো।
অফিস থেকে বাসায় ফিরে পোশাক পাল্টে জিন্সের ট্রাউজারের ওপর কালো একটা টি-শার্ট চাপিয়ে রওনা দিয়েছে জামিল–ঝরনার ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে, যেখানে এখন আর জামিল থাকে না। পৌঁছে একটু যেন হতাশই হতে হলো, সেখানে আগে থেকেই বসে আছে মিলন আর আহসান, অর্থাৎ আজ সে একা অতিথি নয়।
দোরঘণ্টি শুনে দরজা খুলেছে মিলন, ঝরনা তখন ভেতরের ঘরে, মিলন বলল, তোকেও আসতে বলেছে, ব্যাপারটা কী?
রাকিব হাসে, এ প্রশ্নের উত্তর জানে না সে, বাকি দুজনও জানে না। আজকাল আর নিয়মিত দেখা হয় না তিন বন্ধুর। তাই এক দফা কুশল বিনিময় হলো। ঝরনা ঢুকল চা-নাশতার ট্রে হাতে। সাদা-কালো প্রিন্টের একটা জর্জেট শাড়ি, কালো ব্লাউজ, চুলগুলো পেছন দিকে টেনে একটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে আটকানো—এইটুকু সাদামাটা সাজেও ঝলমলে ঝরনা।
আপনাদের আর একসঙ্গে পাই না আজকাল…সবার হাতে নাশতার প্লেট তুলে দিতে দিতে সামান্য হেসে ঝরনা বলল, সময় কত দ্রুত বদলে যায়, তাই না?
এ কথার উত্তর দেয় না কেউ, শুধু একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ বোধহয় শোনা গেল কেউ একজনের।
হাতে নিজের চায়ের কাপটা নিয়ে সোফায় বসল ঝরনা, একটু কৌতুক ও রহস্যমিশ্রিত গলায় বলল, আজ আপনাদের একসঙ্গে কেন ডাকলাম বলেন তো?
পরস্পরের দিকে একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল তিনজন, অভিব্যক্তিতে অজ্ঞতা কিংবা বিস্ময়। ঝরনা হাসল, সারা মুখে ছড়িয়ে পড়া সেই অসাধারণ হাসি।
বন্ধু বলেন বা আত্মীয়, আপনারা ছাড়া আর তো কেউ নেই আমার, তাই আপনাদের না জানিয়ে কিছু করতে পারি না…।
আরও একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি হলো, রহস্যের কোনো মীমাংসা নেই দৃষ্টিতে।
আমি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
চমকে উঠল যেন তিনজনই।
এটা নজর এড়াল না ঝরনার, একটু কৈফিয়তের সুরেই বলল, একটা মানুষের স্মৃতি বয়ে জীবন টেনে নেওয়া বড় কষ্টের…শুধু কষ্টের কেন, বলা যায় অসম্ভব…।
কেন, অসম্ভব কেন? প্রায় মুখ ফসকেই যেন বেরিয়ে

এল আহসানের।
আবার হাসল ঝরনা। ম্লান নীরক্ত সেই হাসি, কী করে বোঝাই…সংসারে একটা একা মেয়ের কষ্টের কথা আসলে কাউকে বলে বোঝানো যায় না আহসান ভাই। তা ছাড়া আমার বয়সের একটা মেয়ে যদি সুন্দরী হয়… আমি তো মোটামুটি সুন্দরীই… না কি রাকিব ভাই?—বলে একটু কৌতুক নিয়েই যেন তাকাল রাকিবের দিকে।
হ্যাঁ হ্যাঁ… তা তো বটেই, আপনি… আপনি… রাকিব কেন জানি গুছিয়ে উত্তরটা দিতে পারে না।
সত্যি বড় কঠিন, এই সমাজে একা একটি মেয়ে… বলে কেমন যেন বিষণ্ন হয়ে পড়ে ঝরনা, এই যেমন গত কিছুদিন ধরে আমার স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান লেগেছেন আমার পেছনে… বিয়ে করতে চান আমাকে, আমার বাবার বয়সী ভদ্রলোক… কী বলব… আমার চাকরিটাই হয়তো থাকবে না।
এত সোজা? দেশে আইন-কানুন নেই নাকি, কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে… প্রয়োজনে মামলা করবেন। মিলন বলল।
সমস্যা তো একটা না, কত মামলা করব? তার চেয়ে এটাই কি বেটার নয়, নিজেই আমি একটা ভালো পাত্র দেখে বিয়ে করে ফেললাম?
সে রকম ভালো কাউকে পেয়েছেন?— মিলনের এই কথার মধ্যে একটু খোঁচা কী ছিল?
সেটা আমলে না নিয়েই ঝরনা বলল, হ্যাঁ, বেশ ভালোই বলতে পারেন, আমার এক কলিগের ভাই শাহরিয়ার, দেখতে-শুনতে ভালো, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করেন…।
ও, বেশ ভালো পাত্র! আহসান বলল।
এই কথাটার মধ্যেও একটু বিদ্রূপের আভাস ছিল কি না বোঝার সুযোগ হয়নি ঝরনার, তার আগেই সেলফোনটা বেজে উঠল তার। ফোনের স্ক্রিনে একবার চোখ বুলিয়ে ‘এক মিনিট, আসছি’ বলে পাশের ঘরে চলে গেল। মিলন ঘরের বাকি দুজনের দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, নিশ্চয় সেই ভালো পাত্রটির ফোন।
ঝরনার অনুপস্থিতিতে ঘরটির আবহ কেমন গুমোট হয়ে রইল, কিংবা সবারই মনের মধ্যে চলছিল নানা কথার গুঞ্জরন, ফলে কিছু মুহূর্ত কাটল প্রায় নিঃশব্দে। ঝরনা ফিরে এসে ধপ করে সোফায় বসেই আগের প্রসঙ্গে ফিরে গেল, আমার সিদ্ধান্তটা বোধ হয় আপনাদের পছন্দ হলো না।
না না, আমাদের অপছন্দ হওয়ার কী আছে…আপনার জীবনের ভালোমন্দ তো আপনিই বুঝবেন। আহসান বলল।
আমার আর কী-ইবা করার আছে বলেন…।
ঝরনার এই কথার সূত্র ধরেই যেন মিলন বলল, বিয়ে করা না-করার সিদ্ধান্তটা আপনার, কিন্তু এই সমাজে স্বামী ছাড়া একটা মেয়ের জীবন চলতে পারে না—এ কথাটা মেনে নিতে পারলাম না…আপনি সে রকম গ্রামের অসহায় মেয়ে নন, আপনার চাকরি আছে, একটা ছেলে আছে… ছেলের মুখের দিকে তাকিয়েও তো…। মিলনের এই কথার মধ্যে কোথাও একটু অভিযোগও যেন আছে।
আহসান বলল, তা ছাড়া আপনার পাশে তো আমরা সব সময়ই ছিলাম, তেমন অসুবিধার কথা আমাদের জানালে পারতেন।
এবার একটু গম্ভীর দেখাল ঝরনার চেহারা, মনে মনে কিছু কথা গুছিয়ে নিচ্ছিল বলে মুখটা একটু শক্তও হয়ে উঠল যেন, আপনারা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন, জামিল মারা যাওয়ার পরের দিনগুলোতে আপনারা পাশে না থাকলে কী যে হতো ভাবতেই পারি না… তবে কি জানেন, আজকাল ভাবি, আপনারাই বা আমার জন্য কতটা নিরাপদ?
রাতের আকাশকে দুই ফালি করে দিয়ে বিদ্যুৎ চমকাল যেন। অনায়াসে এ রকম কঠিন একটা প্রশ্ন তুলে ঝরনার চেহারাটা স্বাভাবিক, বাকি তিনজনই কী বিস্ময়ে কী বেদনায় হঠাৎ বাকরুদ্ধ।
ঝরনা বলল, আহসান ভাই কয়েক দিন আগে আমার জন্মদিনে একটা সোনার নেকলেস উপহার দিয়ে গেছেন, আপনারা দুজন জানেন?
চমকে উঠল রাকিব, মিলনের দিকে তাকাল, তার চোখেমুখেও বিস্ময়।
আপনারা জানেন না, আহসান ভাইয়ের স্ত্রী মালা ভাবিও জানেন না, নিজের স্ত্রীর নেকলেস গোপনে… মানে চুরি করে এনে দিয়েছেন আমাকে।
কে বলেছে? মালা বলেছে তার নেকলেস আমি চুরি করেছি? প্রচণ্ড উত্তেজিত শোনাল আহসানের গলা।
না, সেই সাহস মালা ভাবির নেই, বেচারি স্বামীর ভয়ে এমনিতেই তটস্থ, আমি নিজে তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছি সেই নেকলেস, তখন জেনেছি সেটা তাঁর বিয়ের গয়না।
আহসানের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না, কখনো পায়ের নখ দিয়ে কার্পেট খুঁটছে, কখনোবা সিলিংয়ের পাখাটার দিকে তাকাচ্ছে মুখ তুলে।
ঝরনার চেহারাটাও করুণ দেখাচ্ছে এবার। গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, জামিল বেঁচে থাকতে একসঙ্গে কত বেড়াতে গেছি আমরা, কী আনন্দময় ছিল সবাই মিলে সেই ভ্রমণ, অথচ গত কিছুদিন ধরে মিলন ভাই আমাকে বারবার বলেই যাচ্ছেন তাঁর সঙ্গে একা কক্সবাজারে একদিন বেড়াতে যেতে… আমার ছেলেটাকে এক দিনের জন্য কাজের বুয়ার কাছে রেখে যেতেও বলছেন… একা একজন পুরুষের সঙ্গে এভাবে বেড়াতে যাওয়ার অর্থটা কী দাঁড়ায় বলেন তো?
আরেকবার নিঃশব্দ বজ্রপাত হলো যেন ছোট্ট কক্ষটার মধ্যে, বজ্রাহত তিনজন কেউ তাকাতে পারছিল না পরস্পরের দিকে।
মিলন বলল, আমি ঠিক ওভাবে বলিনি, আমি…। কথাগুলোর মধ্যে জোর ছিল না, নিজের কথা নিজের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারছিল না বলেই কি না কে জানে কথা শেষ না করেই চুপ করে গিয়েছিল সে।
এবার রাকিবের দিকে তাকিয়ে হাসল ঝরনা, সেই হাসিতে একটু স্নেহ বা প্রশ্রয়, বলল, আমি বুঝতে পারি রাকিব ভাই অনেক দিন ধরে আমাকে একটা কথা বলি বলি করে বলতে পারছেন না, মেয়েদের সিক্সথ সেন্স এসব ব্যাপারে খুব ভালো হয়, এটাও বুঝি কখনোই বলতে পারবেন না উনি… বেচারা মনের কথা বোঝানোর মতো শক্তিটাই জড়ো করতে পারছেন না নিজের ভেতর… কী ঠিক বলেছি না রাকিব ভাই?
সবাই তাকিয়ে আছে রাকিবের দিকে, রাকিব চোখটা নামিয়ে রাখে।
ভালো, এই বলতে না পারার মধ্যেও একটা ভালোমানুষিতা আছে, তবে কি এ ধরনের মানুষের ওপর ঠিক নির্ভর করা যায় না…সঙ্গীকে প্রটেক্ট করতে পারবেন এমন ভরসাও তো পাওয়া যায় না।।
এবার ঝরনার দিকে চোখ তুলে তাকায় রাকিব। ঝরনার চোখে করুণা। ভালোবাসা না হোক ঘৃণা তবু সহ্য করা যায়, কিন্তু করুণা? আবার চোখ নামিয়ে নেয় রাকিব।
বেরিয়ে আসার সময় হেসে বিদায় জানিয়েছিল ঝরনা, সেই প্রাণবন্ত হাসি, কিন্তু তিনজনই বুঝতে পারে সুরটা কেটে গেছে। বাইরে বেরিয়ে তাজা হাওয়ার স্পর্শে নতুন করে যেন একবার নিঃশ্বাস নিল সবাই। মিলন কোনো কথা না বলেই উঠে পড়েছে তার গাড়িতে। বাকি দুজন গলি পেরিয়ে রাস্তার মোড়ে আলাদা হয়ে পড়ল দুই পথে। কী এক ঘোরের মধ্যে হেঁটে যেতে যেতে রাকিবের মনে হলো একটি দুর্ঘটনা, একটি মৃত্যুই কি বদলে দিল বন্ধুদের চেনা মুখগুলো, নাকি বন্ধুত্বের নামে একসঙ্গে এত দিন পরস্পরকে ঘিরে থাকাটাই ছিল সাজানো একটি বাগান? নাকি একটি মৌচাকই ছিল, শুধুই একটি মৌচাক!

Advertisements

টোকন ঠাকুর — শেষের পরে

টোকন ঠাকুর ⤵
—শেষের পরে
হতে পারে, সব কথা শেষ হয়ে গেছে
সব ভাষা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে তুসোর জাদুঘরে
যতিচিহ্ন মুছে গেছে সব, রাস্তায় কোনো বিশ্রাম-বিরতি নেই
গন্তব্যপুরের গ্রাম আর চোখেই পড়ে না
তাহলে, এর পরের অবস্থা কী?

কী রেখে যাচ্ছি তবে পুরোনো নদীর কাছে, যে নদীতে একদিন
ভেসে গেছে বেহুলাবান্ধব ঢেউ, সহস্র কবিতা!
কী এঁকে রাখছি তবে চিরকালের মহাদিগন্ত-ফলকে?

কথা যদি শেষ হয়ে যায়, ভাষা যদি লিখে দেয় ‘সমাপ্ত’
কী দিয়ে যাচ্ছি তবে তরুণ কবির হাতে? কী? কী?

তারই-বা কী হবে, কেবলই নতুন বাক্যে ডুব দিয়ে সারা রাত নির্ঘুম
যে মেয়েটি একটি নতুন কবিতা পড়েই পোড়ে ধিকিধিকি! ⤵

অক্টোবর ৩১, ২০১৪

কাইয়ুম চৌধুরী — হেমন্তে যমুনা

কাইয়ুম চৌধুরী ⤵
—হেমন্তে যমুনা

ধূলিওড়া হেমন্তের ধান তোলা মাঠে
লালশাড়ি একাকিনী
নাকছাবি দোলে
ছাগশিশু কোলে
হলুদ প্রান্তর ঘেঁষা বটবৃক্ষ তলে
মঙ্গলহাট—
সুবালার হাতে নকশীবয়ন
ফুলের চয়ন
বিকিকিনির কোলাহল কেমন জমাট।

ভাদ্রের ঘর্মাক্ত তাপ
শ্যামল মুখে উড়ন্ত চিকুরে
গোধূলির জলছাপ—
সুরলহরী কর্ণকুহরে
বহু পুরাতন
লোকজ কথন
ছহিবড় জঙ্গনামা
অতিক্রান্ত হয় কোজাগরি ত্রিযামা।

হেঁটে আসে কারা
ঢেঁকি ছাঁটা চাল কোঁচড়ে বাঁধা
হাটিকুমরুল বাজায় দোতারা।

ভাঙনের শব্দ শোনে যমুনার তীর
শর্ষে খেতে ছাওয়া জমি-জিরাত
নদীগর্ভে বিলীন বিধাতার হাত।

এমনই কপাল
শস্যহীন জাল—
এখনো সুবাস ছড়ায় রসের পিঠে
জয়নবের হাতে।

হেমন্তসন্ধ্যায় ঘুঘুর বিষণ্ন ডাক
ভেঙে পড়ে নদীতীর
যমুনার বাঁক। ⤵

অক্টোবর ৩১, ২০১৪

স্পর্শমণি

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নদীতীরে বৃন্দাবনে সনাতন একমনে
জপিছেন নাম,
হেনকালে দীনবেশে ব্রাহ্মণ চরণে এসে
করিল প্রণাম।
শুধালেন সনাতন, “কোথা হতে আগমন,
কী নাম ঠাকুর?’
বিপ্র কহে, “কিবা কব, পেয়েছি দর্শন তব
ভ্রমি বহুদূর।
জীবন আমার নাম, মানকরে মোর ধাম,
জিলা বর্ধমানে–
এতবড়ো ভাগ্যহত দীনহীন মোর মতো
নাই কোনোখানে।
জমিজমা আছে কিছু, করে আছি মাথা নিচু,
অল্পস্বল্প পাই।
ক্রিয়াকর্ম-যজ্ঞযাগে বহু খ্যাতি ছিল আগে,
আজ কিছু নাই।
আপন উন্নতি লাগি শিব-কাছে বর মাগি
করি আরাধনা।
একদিন নিশিভোরে স্বপ্নে দেব কন মোরে–
পুরিবে প্রার্থনা!
যাও যমুনার তীর, সনাতন গোস্বামীর
ধরো দুটি পায়!
তাঁরে পিতা বলি মেনো, তাঁরি হাতে আছে জেনো
ধনের উপায়।’

শুনি কথা সনাতন ভাবিয়া আকুল হন–
“কী আছে আমার!
যাহা ছিল সে সকলি ফেলিয়া এসেছি চলি–
ভিক্ষামাত্র সার।’
সহসা বিস্মৃতি ছুটে, সাধু ফুকারিয়া উঠে,
“ঠিক বটে ঠিক।
একদিন নদীতটে কুড়ায়ে পেয়েছি বটে
পরশমানিক।
যদি কভু লাগে দানে সেই ভেবে ওইখানে
পুঁতেছি বালুতে–
নিয়ে যাও হে ঠাকুর, দুঃখ তব হবে দূর
ছুঁতে নাহি ছুঁতে।’

বিপ্র তাড়াতাড়ি আসি খুঁড়িয়া বালুকারাশি
পাইল সে মণি,
লোহার মাদুলি দুটি সোনা হয়ে উঠে ফুটি,
ছুঁইল যেমনি।
ব্রাহ্মণ বালুর ‘পরে বিস্ময়ে বসিয়া পড়ে–
ভাবে নিজে নিজে।
যমুনা কল্লোলগানে চিন্তিতের কানে কানে
কহে কত কী যে!
নদীপারে রক্তছবি দিনান্তের ক্লান্ত রবি
গেল অস্তাচলে–
তখন ব্রাহ্মণ উঠে সাধুর চরণে লুটে
কহে অশ্রুজলে,
“যে ধনে হইয়া ধনী মণিরে মান না মণি
তাহারি খানিক
মাগি আমি নতশিরে।’ এত বলি নদীনীরে
ফেলিল মানিক।

২৯ আশ্বিন, ১৩০৬